মামলা-গ্রেফতার থেকে দায়মুক্তির প্রশ্ন আসছে কেন, কারা পাবে?
এ ধরনের দায়মুক্তির প্রয়োজন হলো কেন এবং কারা দায়মুক্তি পাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘গণআন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে যাতে তারা কোনো হয়রানির শিকার না হয়।’
এর আগে রোববার মি. ভূঁইয়া আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা যাতে না নেয়া হয়, সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আসবে বলে জানিয়েছিলেন।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে পুলিশ কনস্টেবল হত্যা মামলায় কয়েকজনকে আটকের প্রসঙ্গে তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন।
তবে হত্যা বা লুটপাটের মতো ঘটনায় তদন্ত করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও রোববার দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৬৯৫টি মামলায় অক্টোবরের তের দিনেই তিন হাজার ১৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র-জনতা ও আপামর জনসাধারণের এক্ষেত্রে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারম্যান জেড আই খান পান্না বিবিসি বাংলাকে বলেন, ফৌজদারি অপরাধে কাউকেই দায়মুক্তি দেয়ার সুযোগ নেই। এখন যেসব চেষ্টা চলছে, সবই বেআইনি চেষ্টা।
আরেকজন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলছেন, ফৌজদারি অপরাধ থাকলে সেটি নির্দেশনা দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার সুযোগ থাকে না।
প্রসঙ্গত, অগাস্ট মাসে আন্দোলন চলার সময় সিরাজগঞ্জে তের জন পুলিশসহ মোট ৪৪ জন পুলিশ হত্যার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
আন্দোলনের সময়েই এর সংগঠকরা এসব ঘটনার সাথে আন্দোলনকারীদের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছিলেন।
গণঅভ্যুত্থান চলার সময় শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সাড়ে সাতশোর বেশি মানুষ নিহত হন,আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
অনেক সরকারি-বেসরকারি ভবন ও যানবাহনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। অনেক থানায় হামলার পর অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। সেসব অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানও শুরু করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, জুলাই ও অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে যারা ভূমিকা রেখেছে বা অংশ নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, গ্রেফতার বা হয়রানি করা হবে না বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে দিয়েছে।
“যে কোনো বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের পর এতে যারা অংশ নেয় তাদের হয়রানি থেকে মুক্ত রাখতে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর ঐতিহাসিক অনেক উদাহরণ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরেও সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলো। কাজেই এটি নতুন কিছু নয়,” তিনি বলেন।
কিন্তু এর মাধ্যমে আন্দোলনের সময় হওয়া সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় আপনারা নিচ্ছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি শুধু যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছে তাদের জন্য প্রযোজ্য।
“কেউ যদি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে থানা লুট বা আক্রমণ বা এমন কোনো অপরাধ করে সেটি তদন্ত সাপেক্ষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিতে পারবে,” তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে মোট ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছে বলে আগেই জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। নিহত পুলিশ সদস্যদের একটি তালিকাও প্রকাশ করেছে তারা। তাতে দেখা যায় গত বিশে জুলাই থেকে ১৪ অগাস্টের মধ্যে মোট চুয়াল্লিশ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হলো সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে থানায় আক্রমণ করে, আগুন লাগিয়ে ১৩ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যার ঘটনা। হত্যার পর একজন পুলিশ সদস্যের গলায় ফাঁস দিয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখার ছবি আসে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে। তিনজন পুলিশ সদস্যকে হত্যার পর পুকুরে ফেলে রাখা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে অসহযোগের প্রথম দিন ৪ঠা অগাস্ট রোববার এই ঘটনা ঘটে।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন এ ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে এবং এর তদন্ত চলছে।
“তদন্তে যাদের দোষী পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে,” বলছিলেন তিনি।
যদিও ওই ঘটনার পর প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেলেও এখনো দায়ীদের গ্রেফতার করা যায়নি।
এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো থানা আক্রমণ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগ আগেই হামলা হয়েছে এমন প্রায় ত্রিশটি থানার তালিকা দিয়েছিলো।
গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় মামলা বা গ্রেফতারের তথ্য গণমাধ্যমে উঠে এলেও এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে খুব একটা ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।
সদ্য ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কর্মী ও সমর্থক দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলায় বা আক্রমণে আহত হয়ে মারা গেছেন এমন খবরও এসেছে গণমাধ্যমে। কিন্তু এসব ঘটনায় মামলা বা গ্রেফতারের তথ্য খুব বেশি জানা যায় না।
0 Comments